শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৫

সংকটে ইসলামী ব্যাংকিং: কমছে হিস্যা, বাড়ছে উদ্বেগ

সংকটে ইসলামী ব্যাংকিং: কমছে হিস্যা, বাড়ছে উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক

দেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে ইসলামী ব্যাংকিং খাত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আস্থার সংকটে এই খাতের ওপর তৈরি হওয়া চাপ এখনো কাটেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমানত সংগ্রহ ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট আমানতে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অংশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ নেমেছে ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে। অথচ এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও এই হার ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোট রেমিট্যান্সের ৩৬ শতাংশের বেশি আসত ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ২০২৫ সালের শেষে তা কমে ২৬ শতাংশের নিচে (২৫.৯৭ শতাংশ) নেমে এসেছে। এ ছাড়া সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক এখনো তাদের তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল গ্রাহকের আস্থা ও শরিয়াহভিত্তিক স্বচ্ছ পরিচালনা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এই খাতের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ফলে আমানতকারীদের একটি অংশ এখন সাধারণ (প্রচলিত) ব্যাংক বা তুলনামূলক স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে।

দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক। এ ছাড়া ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ‘উইন্ডো’ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আমানত ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তিন মাস আগে এই অংশ ছিল ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

শুধু আমানত নয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর হিস্যা কমছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ২৫ হাজার ৭১ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। তিন মাস আগে এই হার ছিল ২৯ দশমিক ২২ শতাংশ।

প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২২ সালে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি ছিল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে পাঁচটি দুর্দশাগ্রস্ত শরিয়াহ ব্যাংককে একীভূত করে একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শরিয়াহ ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম চারটি ব্যাংক বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। গত এক বছরে বিপুল পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিয়েও এসব ব্যাংকের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশে মোট ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের একই সময়ে ৮৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা রেমিট্যান্সের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৩১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা।

তবে এককভাবে সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক তারল্য সংকটে থাকলেও সামগ্রিকভাবে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে তারল্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

মূলত প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও উইন্ডোগুলোর ভালো প্রবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতির এই উন্নতি দেখা গেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়