প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৯
জুলাই সনদ কি বাংলাদেশের পরবর্তী বড় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু?

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা একটি জাতীয় গণভোটেও অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশের জন্য প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ বা জুলাই জাতীয় সনদটি ৬০.২৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়ে অনুমোদিত হয়েছে।
কিন্তু এই গণভোট এখন বিজয়ী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। মঙ্গলবার নবনির্বাচিত বিএনপি সংসদ সদস্যরা নতুন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান, যা সংস্কারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় গণভোটটি আসলে কী নিয়ে ছিল, কেন এটি দেশকে বিভক্ত করেছে এবং সামনে কী হতে যাচ্ছে—তা আমরা এখানে বিশ্লেষণ করছি।
প্রেক্ষাপট কী?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রচলিত কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ওই ব্যবস্থায় সরকারি চাকরিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের (যাদের এখন রাজনৈতিক অভিজাত হিসেবে দেখা হয়) জন্য উল্লেখযোগ্য অংশ সংরক্ষিত ছিল।
বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করলে হাসিনা সরকার নিষ্ঠুর দমনপীড়নের নির্দেশ দেয়। দেশটির আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তথ্যমতে, এতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত এবং ২০,০০০-এর বেশি আহত হন। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা বর্তমানে সেখানেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। হাসিনা নির্বাসনে যাওয়ার পর তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকেও সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়, যারা টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন।
জুলাই চার্টার বা সনদ কী?
হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ২০২৪ সালের আগস্টে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫’ বা ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি করে। এতে সাংবিধানিক সংশোধনী, আইনি পরিবর্তন এবং নতুন আইন প্রণয়নের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিসটেন্স’ (আইডিইএ)-এর মতে, বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে এতে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাবনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সংস্কারগুলো হলো: "নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা।"
সনদে বাংলাদেশের বর্তমান ৩৫০ সদস্যের একক সংসদীয় বডি ‘জাতীয় সংসদ’-এর পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ (Upper Chamber) তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদের গণভোট নিয়ে কয়েকমাস ধরে সংশয় প্রকাশ করছিল এবং মাঝে মাঝে নেতিবাচক ইঙ্গিতও দিচ্ছিল। তবে ৩০ জানুয়ারি দলের নেতা তারেক রহমান প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বিএনপি জানায়, গণভোটে অনুমোদিত হলে তারা সনদটি গ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে উচ্চকক্ষ পূরণের জন্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবহারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে বিএনপি। তাদের যুক্তি, বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার অধীনে এটি সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এখন যেহেতু সনদটি অনুমোদিত হয়েছে, নতুন এমপিদের সনদে উল্লেখিত সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো কার্যকর করার জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। পরিষদ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
গণভোট কি বাংলাদেশে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে?
মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। তাদের দুটি শপথ নিতে বলা হয়েছিল। প্রথমটি ছিল বাংলাদেশের সংবিধান সমুন্নত রাখার সাধারণ শপথ। দ্বিতীয়টি ছিল ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫’-কে সম্মান ও বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা। কিন্তু বিএনপির নবনির্বাচিত এমপিরা দ্বিতীয় শপথটি নেননি। এর ফলে জামায়াত এবং তাদের মিত্র ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)—হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের গঠিত দল—এর সমালোচনা করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদ কীভাবে আইনে পরিণত হবে, তার বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে—সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে সেই এমপিদের নিয়ে, যারা একই অনুষ্ঠানে পরিষদ সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। এর মানে হলো, টেকনিক্যালি এখন কেবল জামায়াত, এনসিপি এবং হাতেগোনা কয়েকজন যারা দ্বিতীয় শপথ নিয়েছেন, তারাই পরিষদে বসার যোগ্য। যেহেতু দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমপি দ্বিতীয় শপথ নেননি, তাই পরিষদ এখনও গঠিত হয়নি। পরিষদ গঠন নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা অস্পষ্ট।
বিএনপির আপত্তির মূল জায়গা কোথায়?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ শপথ অনুষ্ঠানের পর স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপির আইনপ্রণেতারা সনদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কারণ, তাদের মতে, যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংস্কারগুলো কার্যকর করবে, তা এখনও সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "আমাদের কেউ এই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। এই পরিষদ এখনও সংবিধানেরই অংশ নয়। এটি তখনই বৈধ হবে যখন নির্বাচিত সংসদ এটি অনুমোদন করবে।" তবে মঙ্গলবার তিনি সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন: "আমরা রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ হুবহু বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
বোঝা যাচ্ছে, সংস্কার নিয়ে বিএনপির মূল উদ্বেগ সংসদের ১০০ সদস্যের দ্বিতীয় উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এর আগে আল জাজিরাকে বলেছিলেন, "বড় দলগুলো গণভোটের প্রায় সব মূল ইস্যুতে একমত বলে মনে হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়, বিশেষ করে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।"
বাংলাদেশে বর্তমানে ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এফপিটিপি) বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু আছে। এতে একজন ভোটার একজন প্রার্থীকে ভোট দেন এবং যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনি জয়ী হন। এই ব্যবস্থায় একটি দলের প্রাপ্ত মোট ভোটের হার এবং তাদের প্রাপ্ত আসনের হারের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, একটি দল প্রতিটি আসনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে সবকটি আসনেই (১০০%) জয়ী হতে পারে, যেখানে অন্য দল প্রতিটি আসনে ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েও একটি আসনও না পেতে পারে।
যেকোনো দল ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসন পেলে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল হয় বিরোধী দল। গত সপ্তাহের নির্বাচনে ঘোষিত ২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
বিএনপি এফপিটিপি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তি ব্যবস্থাটি বজায় রাখতে চায়। কিন্তু জুলাই সনদে সুপারিশ করা হয়েছে যে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে, যা দলগুলোকে তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আসন দেবে। বিপরীতে, এফপিটিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চকক্ষ গঠন করলে বিএনপি সংসদে তাদের বিশাল আসন সংখ্যার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। আসিফ নজরুল বলেন, "বিএনপি সংসদীয় আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা পছন্দ করে। এই বিরোধ মেটানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।"
সূত্র : আল জাজিরা







