প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৪
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: জ্বালানি বাজারে ঝড়, বাংলাদেশের সামনে কতটা ঝুঁকি?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই সংঘাতের সরাসরি অভিঘাত পড়েছে তেল ও গ্যাসের দামে, আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে এবং জাহাজ চলাচলে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান যদি এই সরু জলপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে, তবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বড় ধাক্কা খাবে। ইতোমধ্যে প্রণালীর কাছে জাহাজে হামলা ও সতর্কবার্তার জেরে বহু তেলবাহী জাহাজ খোলা সমুদ্রে অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি সামরিক হামলার পর উৎপাদন আংশিক স্থগিত ঘোষণা করেছে। কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী ও জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর বাজারে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। একইভাবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো-র স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা সরবরাহ ঝুঁকিকে আরও উসকে দিয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ৮২ ডলার স্পর্শ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ানো অসম্ভব নয়।
সংঘাতের প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ার সূচক নাসডাক কম্পোজিট এবং বিস্তৃত বাজার সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠলেও ইউরোপের বাজারগুলোতে বড় পতন দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন দ্বৈত শঙ্কায়—
১. জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে পারে।
অর্থাৎ, বাজার এখনো পুরোপুরি আতঙ্কিত না হলেও ঝুঁকি-প্রিমিয়াম বেড়েছে। তেল ব্যবসায়ীরা খবরের গতিপ্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। যুদ্ধের খবর এলেই দাম লাফিয়ে উঠছে, আবার সাময়িক শান্তির ইঙ্গিত মিললে কিছুটা নেমে আসছে।
তেল উৎপাদনকারী জোট ওপেক প্লাস প্রতিদিন অতিরিক্ত ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে দৈনিক প্রায় ১০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে এই বাড়তি সরবরাহ খুবই সামান্য।
সমস্যা সরবরাহের ঘাটতির চেয়ে বেশি—অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে কাগজে-কলমে উৎপাদন বাড়লেও বাস্তবে তা বাজারে পৌঁছাবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। ফলে ব্যয়-চালিত মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হয়। ইতোমধ্যে যেসব দেশে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছিল, সেখানে আবার চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তেলের দাম দীর্ঘ সময় চড়া থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হবে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি: এলএনজি ও ফার্নেস অয়েল নির্ভরতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের ওপর উচ্চ নির্ভরতা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে নাজুক করে তুলেছে।
এলএনজি নির্ভরতা
বাংলাদেশের আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় অংশ আসে কাতার থেকে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি-র উৎপাদন বা রপ্তানি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হলে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চাপে পড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তাৎক্ষণিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হবে, যা সরকারের ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী নির্ভরতা
বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি হলে বিকল্প রুটে তেল আমদানি করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হতে পারে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফার্নেস অয়েল মজুত
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য মার্চ পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে। তবে এপ্রিল থেকে নতুন চালান সময়মতো না এলে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
মূল্যস্ফীতির চাপ
সরকার আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকলে মূল্য সমন্বয় এড়ানো কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
করণীয় কী
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন— সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণ করে মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমানো, অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানির দাম সমন্বয়ে স্বচ্ছ ও ধাপে ধাপে নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা—জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বহুমুখীকরণ ছাড়া ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি সংকটে রূপ নেয়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি সতর্কবার্তা—আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। সাময়িক আশ্বাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, সরবরাহের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।







