রবিবার, ০৮ মার্চ, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩৪

সহসাই হচ্ছে না জ্বালানি সংকট

সহসাই হচ্ছে না জ্বালানি সংকট
অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এতে বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিলেও সরকার বলছে, আপাতত দেশে কোনো জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। পর্যাপ্ত মজুত ও চলমান আমদানির কারণে অন্তত মার্চ মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, চলতি মাসের চাহিদা মেটাতে ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর একটি অংশ ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব এবং অপারেশন উইংয়ের প্রধান মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিপিসির কাছে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুত আছে। এর বাইরে নতুন আমদানির চালানও আসছে।

তিনি বলেন, আমদানিকৃত ডিজেলের একটি অংশ ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। কিছু জাহাজ সমুদ্রে রয়েছে এবং কিছু জাহাজ জাহাজীকরণের প্রক্রিয়ায় আছে। ফলে মার্চ মাসে দেশে ডিজেলের সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে তার একটি বড় কারণ আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কেনা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। এতে পেট্রোলপাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় তৈরি হচ্ছে এবং সাময়িকভাবে কৃত্রিম সংকটের পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দৈনিক চাহিদা বেড়ে ২ হাজার ৩০০ টনের বেশি হয়েছে।

বিপিসির গতকালের হিসাবে দেশে পেট্রলের মজুত রয়েছে ১৫ হাজার ৫১৭ টন। আজ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭০ টন করে পেট্রল সরবরাহ করা হবে। এ হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় ১৫ দিন চলার কথা। এর পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টন পেট্রল সরবরাহ পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও নিয়মিত সরবরাহ আসবে।

বিপিসির হিসাবে, চলতি মাসে দেশের সরকারি ও বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রল ও অকটেন মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। ফলে আপাতত মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আমদানি ব্যাহত হলে আগামী মাসে ইআরএলের উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের মোট চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। সে হিসাবে দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাবে দৈনিক চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার টনে পৌঁছেছে।

আজ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন করে ডিজেল সরবরাহ করা হবে। নতুন একটি জাহাজ আসার পর গতকাল পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন। এ মজুত দিয়ে প্রায় ১৮ দিন চলার কথা।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, ১৩ মার্চের মধ্যে ডিজেল নিয়ে আরও পাঁচটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজে মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল রয়েছে, যা দৈনিক ১২ হাজার টন চাহিদা ধরে আরও প্রায় ১২ দিন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এ ছাড়া চলতি মাসেই দেশের সরকারি ও বেসরকারি শোধনাগার থেকে প্রায় ৫০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যাবে।

বর্তমানে দেশে বছরে সরবরাহ করা মোট ডিজেলের প্রায় ১৮ শতাংশ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে আগামী মাসে ডিজেল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল। যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলবাহী কয়েকটি জাহাজের আগমনে কয়েক দিন করে বিলম্ব হয়েছে। জাহাজ দেরিতে আসায় সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে ১৪ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে আরও ১১টি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টন এবং বাকি দুটি জাহাজে ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। তবে এসব জাহাজের নির্দিষ্ট আগমনের সময় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বিপিসি। নির্ধারিত সময়ে এসব জাহাজ পৌঁছাতে পারলে ডিজেলের কোনো সংকট হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে দেশে মোট ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ লাখ ৮ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে এবং দেশীয় শোধনাগার থেকে সরবরাহ এসেছে ১৯ লাখ ৩৬ হাজার টন।

কর্মকর্তারা জানান, দেশে পেট্রোল ও অকটেন আমদানির প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় উৎপাদন থেকেই এই দুটি জ্বালানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে এ ক্ষেত্রেও সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ নেই।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার আগাম সতর্কতা নিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছু সমন্বয় করা হয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সংকটের আশঙ্কা নেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হিসেবে আসে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয়। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ আসে আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য হিসেবে।

অপরিশোধিত তেলের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন ‘আরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড বাংলাদেশে আসে। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি অ্যাডনকের মাধ্যমেও তেল আমদানি করা হয়। এসব তেলবাহী জাহাজকে পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়েই চলাচল করতে হয়।

পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরকার-টু-সরকার চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান।

সাম্প্রতিক সময়ে বিপিসি তেল কিনেছে পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক (চীন), ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান (মালয়েশিয়া), পিটিটি (থাইল্যান্ড), ওকিউ ট্রেডিং (ওমান) এবং এনওসি (ইউএই) থেকে।

বিপিসি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকবে লো-সালফার ডিজেল—প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন। এ ছাড়া ১ লাখ ৮৫ হাজার টন জেট এ–১ জ্বালানি, ১ লাখ টন ৯৫ অকটেন পেট্রোল, ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০ হাজার টন লো-সালফার মেরিন ফুয়েল আমদানি করা হবে। এই আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮২ মিলিয়ন ডলার।

এর বাইরে ভারত–বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ২০২৬ সালে অতিরিক্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টন লো-সালফার ডিজেল আমদানি করা হবে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে করা ১৫ বছর মেয়াদি সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় এই সরবরাহ হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার।

বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরামকোর রাস তানুরা থেকে বাংলাদেশে তেল আনতে হলে জাহাজগুলোকে প্রথমে পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। ইরান জানিয়েছে, এই সামুদ্রিক পথ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য বন্ধ থাকবে। সে হিসেবে বাংলাদেশসহ অন্য দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা পড়বে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে যে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে, তার মধ্যে ডিজেল প্রায় ১৪ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি ইতিমধ্যে সাতটি জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার কাজ শেষ করেছে।

তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও তীব্র হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। দাম কোথায় গিয়ে স্থিত হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

তার মতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকেও জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়