মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০১

রংপুরে স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের ৪ খুন, পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন

রংপুরে স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের ৪ খুন, পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
অনলাইন ডেস্ক

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে বেশ কিছু অমিল পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে তাঁদের চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। তিনি বলেন, নিহতদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থ কোনো রাসায়নিক বা কেমিক্যাল বার্নের কারণে হয়নি। কয়েক দিন মরদেহ পড়ে থাকায় পচন প্রক্রিয়ায় মুখের রং ও চেহারায় এমন পরিবর্তন হয়েছে।

ময়নাতদন্তের সময় বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

এর আগে রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেছিলেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে টান দেওয়ায় তাঁর চোখ বেরিয়ে আসে এবং দাঁতের চোয়াল ভেঙে যায়। পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের অমিল নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আসামির পোশাক নিয়েও বিতর্ক

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্টের সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার শার্টের মিল পাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দাবি, একই ধরনের শার্ট একাধিক ব্যক্তির পরনে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস দাবি করেছেন, তাঁর ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তার পরনে ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি ছিল। অন্য কোনো কাপড় তিনি দেননি। অন্যদিকে ডিবির উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, সিদ্ধার্থকে যেভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, সেভাবেই তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

আসামিরা কখন ঘটনাস্থল ছাড়ে, তা নিয়েও প্রশ্ন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল। বাধা দেওয়ায় শিক্ষকসহ পরিবারের চারজনকে হত্যা করে তারা। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাসা থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে।

তবে আসামিদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে ঘটনার সময় নিয়ে পুলিশের তথ্যের সঙ্গে গরমিল পাওয়া গেছে। সিদ্ধার্থের বাবা দাবি করেছেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে তাঁর ছেলে বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে পাশের বাসায় যায়। শনিবার রাত ৩টার দিকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে মুগ্ধের মা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার পর মুগ্ধ নিজের ঘরে যায়। শুক্রবার সকালে তিনি দেখতে পান, মুগ্ধ ঘরে নেই। পরে দুপুরে বাড়ি ফিরে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা জানায়।

চারটি ফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ধোঁয়াশা

হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের চার সদস্যের মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছিল, আসামিরা আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে, সে জন্য বাসার দুটি মোবাইল ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল। তবে বাকি দুটি ফোনের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ঘটনার রাতে ওই বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল বলেও জানা গেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে সংযোগ সচল করে। ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মনের দাবি, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সংযোগ খুলে রাখা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেশীরাও কিছু টের পাননি

পুলিশের দাবি, পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ দিয়ে আসামিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়েছিল। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে পাশের ভবনের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, তিনি এ ঘটনার কিছুই টের পাননি।

তিনি বলেন, গরমের কারণে রাতে ফ্যান চালু থাকায় বাইরে কোনো শব্দ বা চিৎকার হলেও তা শোনা সম্ভব ছিল না। আসামিদের কাউকেও তিনি চিনতেন না এবং তাঁদের ওই ভবনের ছাদে যাতায়াতের বিষয়েও কিছু জানতেন না।

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। গত শনিবার রাতে তাঁর, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তৈরি হওয়া অসঙ্গতি ও প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তেই মিলবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়