প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২২
সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে অস্ত্র, নির্বাচন ঘিরে ‘শঙ্কা’

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এর মধ্যে সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র; এসব আগ্নেয়াস্ত্র চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে। স্টার নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের নানা তথ্য।
’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা অস্ত্র নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহার হতে পারে বলে শঙ্কা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, চোরাচালানের রুট বন্ধ না হলে নির্বাচন ঘিরে দেখা দিতে পারে নিরাপত্তাহীনতা।
শরীফ ওসমান হাদি হত্যা, মুসাব্বির হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এক ডজন খুনের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। খুনের পেছনে কখনও রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা দখল-বাণিজ্য; কারণ ভিন্ন হলেও অস্ত্র এক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল ও রিভলভার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে জানা যায়, দেশে বেশিরভাগ অস্ত্র ঢুকছে সীমান্ত দিয়ে। ঠিক কতগুলো রুট দিয়ে আসছে এসব অস্ত্র- তার সঠিক হিসাব না থাকলেও মূল চ্যানেল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও সুন্দরবন। তবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢোকার তথ্য আসে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে।
মিয়ানমার-বাংলাদেশের স্থলসীমানা মূলত নাফ নদী, পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত। এসব সীমানার বেশ কয়েকটি পয়েন্ট অরক্ষিত। সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সোর্স থেকে নানা তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যানুযায়ী, টেকনাফ থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত নজরদারি থাকলেও দেশে ঢুকছে অস্ত্রের চালান।
মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্তে বিজিবির নিরবচ্ছিন্ন টহল জোরদার রয়েছে; দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে নদীপথ- সবখানেই তাদের নজরদারি। সীমান্ত এলাকার মোড়ে মোড়ে রয়েছে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনী; লক্ষ্য একটাই, নিরাপত্তা ও চোরাচালান প্রতিরোধ।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন সোর্স বলেন, ‘অস্ত্র ঢুকছে ঈদগড়, বাইশফাঁড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফুলছড়ি, সোনাইছড়ি, বালুছড়ি সীমান্ত দিয়ে। জি-৩, জি-৪ এবং চায়না অস্ত্র মিয়ানমারের বার্মা থেকে রোহিঙ্গাদের হাতে আসে; পরে বিভিন্ন জায়গায় তারা পাচার করে। এসব অস্ত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হাতবদল হয়।’
শুধু একজন নয়, আরও কয়েকজন সোর্সের সঙ্গে কথা বলে স্টার নিউজের অনুসন্ধানী দল। তাদেরই একজন অস্ত্র চোরাচালান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।
ওই তথ্যের সূত্র ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গহীন অরণ্যে দেখা হয় চক্রের দুই সদস্যের সঙ্গে। তারা জানান, ‘মিয়ানমার সীমান্তের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র। সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায়, আরও গোপনে কাজ করছে চক্রগুলো। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারের তৈরি অস্ত্র দেশে ঢুকছে।’
চক্রের সদস্যদের দাবি, ‘মিয়ানমারে আমাদের লোক আছে। আমরা তাদের থেকে নিয়ে আসি। এসব অস্ত্র কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকা যায়।’
মামলা কাঁধে নিয়ে অস্ত্র চোরাচালানে চক্রের সাথে কাজ করছেন অনেকেই। তবে সুযোগ পেলে ফিরতে চান স্বাভাবিক জীবনে। চক্রের দুই সদস্য বলেন, ‘বিজিবি, পুলিশের ভয় নিয়ে পাহাড়ে থেকেই কাজ করছি। এগুলো আমাদের থেকে নিয়ে যায়; এসব কাজে আর মনে সায় দেয় না। সুযোগ পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা, সীমান্ত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একাধিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের সাথেও যোগাযোগ করা হয়। তারাও অস্ত্র চোরাচালান, রুট ও গ্রুপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। বিভিন্ন সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যের সাথে মিল পাওয়া যায় চক্রের সদস্যদের বক্তব্যে।
মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে, ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তও হয়ে উঠেছে অস্ত্র চোরাচালানের নীরব করিডোর। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের ১৪টি রুট দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে বাংলাদেশে; এসব রুটের বেশিরভাগই অরক্ষিত। অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত প্রায় ডজন খানেক গ্রুপ; যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর।
বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে প্রাণঘাতী এসব অস্ত্র ঢুকছে দেশে। ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহরে; বিশেষ করে ‘নির্বাচনের মাঠে’। যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রের মজুতও চলছে। কক্সবাজারের এমন একটি চক্রকেও খুঁজে বের করা হয়। চক্রের এক সদস্যের দাবি, ‘ডাকাতি, দখল-বাণিজ্য ও নির্বাচনের আগে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার হচ্ছে এসব অবৈধ অস্ত্র।’
বিজিবির তথ্য বলছে, গত বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি মিলে এক হাজার ২০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে সংস্থাটি। সম্প্রতি মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও জব্দ হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র।
অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে বিজিবি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, ‘এটা একটি জটিল সীমান্ত। এই মুহূর্তে সেখানে কোনো সরকারি বাহিনী নেই। একটি নন-স্টেট অ্যাক্টর সেখানে কাজ করছে। যাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ ও বিনিময়ের সমস্যা আছে। এ কারণে কন্টিনিউয়াস (প্রতিনিয়ত) যোগাযোগ করতে পারি না। চোরাচালান রোধে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবঃ) ড. মোহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভারত ও মিয়ানমার বর্ডারে প্রায় ৩৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপ কাজ করছে। যদি সেইভাবে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা না যায়, তাহলে সামনের নির্বাচনে আমরা একটা বিশৃঙ্খল বা অস্ত্রবাজি দেখতে পারি।’







