বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ২৩:৩১

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর: প্রত্যাশা-প্রাপ্তি ও কূটনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর: প্রত্যাশা-প্রাপ্তি ও কূটনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের
অনলাইন ডেস্ক

প্রতিটি নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নয়, এটি হয়ে ওঠে সেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান জানান দেওয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং প্রায় ১৭ বছর পর বিএনপির রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করে তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া ও চীনকে। ফলে দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক মহলে এই সফর ঘিরে তৈরি হয়েছে আগ্রহ, প্রত্যাশা এবং নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

একদিকে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জনশক্তি রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়া, অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী চীন—এই দুই দেশ সফরের সূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্যদিয়ে নতুন সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি সামনে আনছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মালয়েশিয়া: শ্রমবাজার, আস্থা ও অর্থনীতির বাস্তবতা

বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকা আজও বিদেশগামী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। সেই বাস্তবতায় মালয়েশিয়া শুধু একটি বন্ধুপ্রতিম দেশ নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই বাজার আবারও খোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে।

সফরের পর দুই দেশ ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। পাশাপাশি সংস্কৃতি খাতে একটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে।

জ্বালানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি, পর্যটন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো বিনিয়োগ ঘোষণা না এলেও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মালয়েশিয়া সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আস্থার নতুন পরিসর তৈরি হওয়া এবং শ্রমবাজার ইস্যুতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমান প্রকাশ। কারণ শ্রমবাজার বাস্তবিকভাবে খুলে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পৌঁছাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে।

চীন: উন্নয়ন কূটনীতির দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণ

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন চীনে অবস্থান করছেন। চীনের দালিয়ানে তিনি সামার দাভোস ফোরামে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী ধাপে বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অংশীদার। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ থেকে শুরু করে কর্ণফুলী টানেল পর্যন্ত—বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীনের ভূমিকা বাংলাদেশের উন্নয়ন চিত্রে দৃশ্যমান।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বাণিজ্য চুক্তি আগামী বছরের মধ্যে সম্পন্নের আশা

এবারের সফরের আলোচনায় রয়েছে তিস্তা প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ।

বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে যদি পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে নতুন গতি আনতে পারে।

‘হাই-ভোল্টেজ’ নাকি উন্নয়ন কূটনীতি?

সফরটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো—এটি কতটা ‘হাই-ভোল্টেজ’ সফর।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের সঙ্গে তুলনা টেনে কেউ কেউ প্রটোকল ও সফরসঙ্গীদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল মনে করেন, চীনের মতো পরাশক্তির সঙ্গে আলোচনায় সাধারণত শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা বা সফরসঙ্গীর তালিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি চূড়ান্ত মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড নয়।

একটি সফরের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হয় আলোচনার ফলাফল, চুক্তি, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

সেই বিবেচনায় এই সফরকে ভূরাজনৈতিক ‘হাই-ভোল্টেজ’ পর্ব না বলে বরং উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখাই অধিক যৌক্তিক।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক একদিনে গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই সফর একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ।’

তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

চীন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী হতে শুরু করে। পরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন সরকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে।’

এক সফর, বহু সম্ভাবনা

বিভিন্ন কারণেই তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর শুধু কোনো চূড়ান্ত সাফল্যের গল্প নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার সূচনা।

বিনিয়োগ কতটা আসে, শ্রমবাজার কতটা খুলে যায় এবং ঘোষিত উদ্যোগগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে এই সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন।

এক সফর, অনেক প্রশ্ন, অপেক্ষা উত্তরের

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক মোড় বা তাৎক্ষণিক ‘বড় ব্রেকথ্রু’ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা, যেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে বিদেশ সফরের সাফল্য আর শুধু প্রটোকল, ছবি বা যৌথ বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এখন প্রশ্ন একটাই—এই সফর কি সত্যিই দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারবে? সময়ই বলে দেবে সেই প্রশ্নের উত্তর, এখন শুধু তারই অপেক্ষা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়