মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৬:১৬

বগুড়ায় ১৯ মাসে এইচআইভি শনাক্ত ৯৩, আক্রান্তদের ৮৭ শতাংশ পুরুষ

বগুড়ায় ১৯ মাসে এইচআইভি শনাক্ত ৯৩, আক্রান্তদের ৮৭ শতাংশ পুরুষ
অনলাইন ডেস্ক

বগুড়ায় এইচআইভি সংক্রমণের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। গত ১৯ মাসে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং (এইচটিসি) সেন্টারে ২ হাজার ১৬৪ জনের পরীক্ষা করে ৯৩ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৮১ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং তৃতীয় লিঙ্গের দুজন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৭ শতাংশই পুরুষ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একই সময়ে বগুড়া জেলার ৯২ জন এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া এইচআইভি সন্দেহে মোট ৫৯৭ জন সেন্টারে নিবন্ধন করেছেন। গত ১৯ মাসে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে গত সাত মাসেই মারা গেছেন তিনজন।

চিকিৎসকরা জানান, শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন এইচআইভি পরীক্ষার জন্য আসেন। কারও শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সেলিং দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা হয়। আক্রান্তদের বিনামূল্যে ওষুধও সরবরাহ করা হয়।

শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে শুধু বগুড়া নয়, বৃহত্তর রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। এই অঞ্চলে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইচটিসি সেন্টার রয়েছে।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক, পুরুষে পুরুষে যৌন সম্পর্ক, যৌনকর্মীদের মাধ্যমে সংক্রমণ, পরীক্ষাবিহীন রক্ত গ্রহণ এবং অন্যের ব্যবহৃত সুঁই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার এইচআইভি সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

সম্প্রতি শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার এক দম্পতি চিকিৎসা নিতে আসেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা জানান, পরীক্ষায় স্বামী-স্ত্রী দুজনের শরীরেই এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা এইচআইভি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য বন্ধের আহ্বান জানান।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫৫ বছর বয়সী এক এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি জানান, রোগ শনাক্ত হওয়ার পর তিনি চরম মানসিক সংকটে ভুগেছেন। তবে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। তার মতে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সেলর আব্দুস সালাম বলেন, অনেক রোগী এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর হতাশায় ভেঙে পড়েন। তাই তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় এনে মানসিকভাবে শক্ত রাখা এবং চিকিৎসা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মো. সুলতান ইবনে সাঈদ বলেন, অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া আক্রান্ত মা থেকে গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান কিংবা বুকের দুধের মাধ্যমেও শিশুর শরীরে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিবার যৌনমিলনে সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার, একজন যৌনসঙ্গীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা, পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ না করা এবং ব্যবহৃত সুঁই বা সিরিঞ্জ এড়িয়ে চলার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

চিকিৎসকদের মতে, এইচআইভি নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পরীক্ষা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়