প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৫
রাজধানীর তিন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ

রাজধানীর তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃথক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মারধর ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
জানা যায়, সর্বপ্রথম সকালের দিকে উত্তেজনা দেখা দেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি এবং পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মারামারির ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অংশ নিতে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে দুপক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধে।
সংঘর্ষে জকসু ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ছাত্রদলও তাদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হওয়ার দাবি করেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি ও শিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রক্টোরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থী, জকসু সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় আমি শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গেলে আমার জামা ছিঁড়ে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাস থেকে আমাকে বের করে দেয় তারা।’
জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস ও ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখকে বেধড়ক মারধর করেছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে ছাত্রদলেরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সকালে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও বিকেলে ছাত্রশক্তির সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ এখনও চলমান রয়েছে। ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন।
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গ্যালারি-২-এ শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এতে শিবিরের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাখা অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেককে মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের দাবি, শিবিরের বহিরাগত নেতা-কর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে উসকানিমূলক আচরণ করেন এবং ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করেন। এর জের ধরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, ‘শিবির সুপরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তারা অবস্থান নিয়েছেন।’
ঘটনার পর ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল করেন এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস।
দিনের শেষ ভাগে রাজধানীর বকশিবাজারে অবস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেলে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত দুই ছাত্রদল নেতা ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আহতরা হলেন- মাদরাসাটির ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সানাউল্লাহ (৩০) ও লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি (২৭)।
আহত রাব্বি আমাদের প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করে জানান, তিনি মাদরাসাটির ছাত্র না। তবে সেখানে তার অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে। তাদের সঙ্গেই বিকেলে মাদরাসা চত্ত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তখনই শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। লাঠিসোঁটা দিয়ে পেটায় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, সানাউল্লাহর দুই পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া রাব্বির বাম পায়ে ইটের আঘাত এবং পড়ে গিয়ে বাম হাতে আঘাত পেয়েছেন। তাদেরকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
একই দিনে রাজধানীর তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাসগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।







