শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:৩৩

খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী

খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে আসেন এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়িতে বলে Banglapedia-তে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিএনপির নিজস্ব জীবনীতে জন্মসাল ১৯৪৬ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ৮০ বছর বলে বিএনপি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে জন্মসাল নিয়ে সূত্রভেদে পার্থক্য রয়েছে।

দিনাজপুরে তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কাটে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে আটক করে; বিজয়ের পর তিনি মুক্ত হন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি দ্রুত দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত করে।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর প্রথম মেয়াদে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতে বিভিন্ন সংস্কার এবং নারীর শিক্ষায় অগ্রগতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর সরকারের সময়ে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন ও রাজনৈতিক সংকটের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদে শিক্ষা, নারীশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে Forbes-এর বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় তিনি ২৯তম স্থানে ছিলেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। ২০০৮ সালে মুক্তির পর তিনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিএনপি বিরোধী দলে পরিণত হয়। ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘদিনের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যা নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তোলে।

২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর মুক্তির পথ সম্পূর্ণ হয়।

পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে করা গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর কয়েকটিতে আদালতের রায়ে তিনি খালাস পান। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আগের দণ্ড বাতিল করে তাঁকে খালাস দেয়।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পায় এবং প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল্যায়ন ভিন্ন। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা; সমালোচকদের কাছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক মেয়াদ নানা বিতর্ক, সংঘাত ও শাসনসংক্রান্ত প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়নে প্রশংসা ও সমালোচনা—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়