বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫১

নবীজি (স.)-এর জন্মের আগে আরব কেমন ছিল?

নবীজি (স.)-এর জন্মের আগে আরব কেমন ছিল?
অনলাইন ডেস্ক

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আগমনের আগে আরব সমাজ ছিল নানা ধর্মীয় বিভ্রান্তি, গোত্রীয় সংঘাত ও সামাজিক অনাচারে জর্জরিত। তবে সেই সমাজে সাহস, অতিথিপরায়ণতা, উদারতা, আত্মমর্যাদা ও বাগ্মিতার মতো কিছু প্রশংসনীয় গুণও ছিল। মূল সংকট ছিল সঠিক বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবনব্যবস্থার দিকনির্দেশনার অভাব।

এই সময়কে ইসলামের ইতিহাসে ‘জাহেলিয়াতের যুগ’ বলা হয়। জাহেলিয়াত বলতে শুধু অজ্ঞতা বা অশিক্ষা বোঝায় না; বরং আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে থাকা এবং ভুল বিশ্বাস ও অনৈতিক জীবনব্যবস্থাকে বোঝায়।

মূর্তিপূজায় আচ্ছন্ন ধর্মীয় জীবন

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের আগে আরবের ধর্মীয় জীবনে শিরক ও মূর্তিপূজা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর তাওহিদের শিক্ষা অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। মানুষ আল্লাহকে স্বীকার করলেও বিভিন্ন মূর্তি ও উপাস্যকে তাঁর সঙ্গে শরিক করত।

ইসলাম এসে মানুষকে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানায়। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।’ (সুরা বাকারা: ১৬৩)

গোত্রীয় বিভাজন ও সংঘাত

তৎকালীন আরব সমাজ ছিল গোত্রকেন্দ্রিক। গোত্রের সম্মান, স্বার্থ ও প্রতিশোধকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘাত সৃষ্টি হতো। কোনো কোনো বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলত এবং এক প্রজন্মের প্রতিশোধ পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ত।

রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষের মধ্যে গোত্রীয় অহংকারের পরিবর্তে ঈমান ও তাকওয়ার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষের মর্যাদার মূল মাপকাঠি বংশ বা গোত্র নয়, বরং তাকওয়া। (সুরা হুজুরাত: ১৩)

কন্যাশিশুর প্রতি নির্মমতা

জাহেলি আরব সমাজের অন্যতম ভয়াবহ দিক ছিল কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করা। কিছু পরিবার কন্যাশিশুর জন্মকে লজ্জা বা বোঝা মনে করত। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনাও ঘটত।

কোরআন এই নির্মমতার কঠোর নিন্দা করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির: ৮-৯)

ইসলাম এসে কন্যাসন্তান ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষায় সুস্পষ্ট বিধান দেয়।

মদ, জুয়া ও নানা সামাজিক অনাচার

মদ্যপান ও জুয়া তৎকালীন আরব সমাজে প্রচলিত ছিল। এর পাশাপাশি এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের মতো অনাচারও দেখা যেত।

ইসলাম এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। কোরআনে মদ ও জুয়াকে শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করে তা বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা মায়িদা: ৯০)

অন্ধকারের মাঝেও ছিল কিছু ভালো গুণ

জাহেলি আরব সমাজকে শুধু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। তাদের মধ্যে অতিথিপরায়ণতা, সাহস, উদারতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং ভাষা ও কবিতায় অসাধারণ দক্ষতা ছিল।

ইসলাম এসব গুণকে বিলীন করেনি; বরং সঠিক বিশ্বাস ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সেগুলোকে পরিচালিত করেছে। উদারতা পরিণত হয়েছে দান-সদকায়, সাহস সত্যের পক্ষে দৃঢ়তায় এবং আত্মমর্যাদা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষায়।

‘জাহেলিয়াত’ কেন বলা হয়?

আরবদের ভাষা, কবিতা, স্মৃতিশক্তি ও বাগ্মিতা যথেষ্ট উন্নত ছিল। তাই ‘জাহেলিয়াত’ বলতে তাদের জ্ঞান-বুদ্ধির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি বোঝানো হয় না। মূল সমস্যা ছিল সঠিক বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবন পরিচালনায় আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে থাকা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এর আগে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় ছিল।’ (সুরা জুমুআ: ২)

রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষের বিশ্বাসকে শুদ্ধ করেন, চরিত্র পরিশুদ্ধ করেন এবং জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনার অধীনে পরিচালনার শিক্ষা দেন।

একজন নবী, একটি সমাজের পরিবর্তন

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দাওয়াত আরব সমাজের বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। মূর্তিপূজার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাওহিদ, গোত্রীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে গড়ে ওঠে ঈমানের ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায়ের পরিবর্তে গুরুত্ব পায় ন্যায়বিচার।

মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে ওঠে তাকওয়া। এতিম, দরিদ্র, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)

আরবের জন্য নয়, সমগ্র মানবতার জন্য

রাসুলুল্লাহ (স.) আরবের মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর দাওয়াত কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)

আরও বলা হয়েছে, ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসুল।’ (সুরা আরাফ: ১৫৮)

জাহেলিয়াত থেকে আলোর পথে

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আগমন আরব সমাজের জন্য এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করে। শিরকের পরিবর্তে তাওহিদ, গোত্রীয় অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়া, সামাজিক অবিচারের পরিবর্তে ন্যায় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবর্তে উত্তম চরিত্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই পরিবর্তন দেখিয়ে দেয়, একটি সমাজের প্রকৃত সংস্কার শুরু হয় মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও চরিত্রের পরিবর্তনের মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ (স.) সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়ে আরব সমাজকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা আজও তাওহিদ, ন্যায়, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রের বিশ্বজনীন আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়