প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১
ফলের বাজারে আগুন, কমলা ৫৫০ ও মাল্টা ৪৫০ টাকা কেজি

রাজধানীর বাজারে ফল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। খুচরা বাজারে এক কেজি কমলার দাম উঠেছে ৫৫০ টাকা। মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। বছরের এ সময়ে দেশে কমলার মৌসুম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে কমেনি দাম। খোলা বাজারের তুলনায় সুপারশপে এসব ফলের দাম আরও বেশি।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ফল ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে কমলা ৫৫০ টাকা, মাল্টা ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, আঙুর ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, নাশপাতি ৩০০ টাকা, ডালিম ৪০০ টাকা এবং দেশি ড্রাগন ফল ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কলা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেঁপে ও তরমুজ ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে সুপারশপে সবুজ আপেল ৫১০ টাকা, গালা আপেল ৪৫৫ টাকা, মাল্টা ৫১৫ টাকা, কমলা ৬৬৮ টাকা এবং নাশপাতি ৩৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
দেশে উৎপাদিত কমলার মৌসুম মূলত শরৎ থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত। মৌলভীবাজারের জুড়ীতে অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি স্থানীয় জাতের কমলার ভরা মৌসুম থাকে। রাঙামাটির নানিয়ারচরেও নভেম্বরের শুরুতে কমলা পাকতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত গাছে থাকে।
অর্থাৎ অক্টোবর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্থানীয় কমলা বাজারে আসার কথা। তবে দেশের উৎপাদন মোট চাহিদা পূরণ করতে না পারায় আমদানিকৃত কমলার ওপর বাজারের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। ফলে আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
মাল্টার দাম বাড়ার কারণ নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরবরাহ ঘাটতি মাল্টার দাম বাড়ার অন্যতম কারণ।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন। অথচ কোনো কোনো সপ্তাহে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা দেশে এসেছে।
সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের নানা জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক আমদানিকারক মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণেও ব্যবসায়ীদের বাড়তি আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে।
মাল্টার আমদানি মূল্য ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিশর থেকে আমদানি করা মাল্টার প্রতি কেজির গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারে তা ৫২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও কীভাবে মাল্টার খুচরা দাম এত বেশি হচ্ছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
গত ৩ অক্টোবর সচিবালয়ে ফলের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না। আমদানি করা মাল্টার অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি ফলের দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ের কর-শুল্কও বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ মোট করভার অনেক ক্ষেত্রে ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্যেও সাইট্রাসজাতীয় ফলের একটি শ্রেণিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
ফলে আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, জাহাজ ভাড়া, বন্দর খরচ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও পচনজনিত ক্ষতিসহ বিভিন্ন ব্যয় যোগ হয়ে কয়েক ধাপে বেড়ে যায় ফলের খুচরা দাম।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো এবং দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন জাতের কমলা ১৮০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং মাল্টা ২২০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।
কয়েক মাসের ব্যবধানে কমলার দাম এখন ৫৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির সর্বোচ্চ দামের তুলনায় কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কমলার দাম। একই সময়ে মাল্টার সর্বোচ্চ দাম ২৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
খিলগাঁও এলাকার খুচরা ফল ব্যবসায়ী জলিল মোল্লা বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা কেজিতে বড়জোর ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ করেন। পাইকারি বাজারেই মূলত দাম বেশি। কয়েক দিন ধরে তিনি কমলা আনছেন না, কারণ দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা কিনতে চাচ্ছেন না।
ক্রেতা আজমল ফুয়াদ বলেন, কমলার কেজি ৫৫০ টাকা এবং মাল্টা ৪৫০ টাকা—এটা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি। শিশুদের পছন্দের ফল হওয়ায় পরিবারের জন্য কিনতে ইচ্ছে করলেও অতিরিক্ত দামের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি সবজির দামও বেড়েছে। ফলে ফলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য তা কেনা কঠিন হয়ে পড়বে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।







