প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৯
দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ

দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এখন পর্যন্ত ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে, যা দলটিকে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নিয়ে গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আইনের শাসন ও জাতীয় ঐক্য অগ্রাধিকার
টাইমের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, তার সরকারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। এরপর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। তার ভাষায়, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আদর্শ যাই হোক না কেন, জাতীয় ঐক্য ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সহিংসতায় প্রাণ হারান ১ হাজার ৪০০–এর বেশি মানুষ। এর আগের ১৫ বছরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও ছিল ব্যাপক। এসব ঘটনার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতায় গেলে এসব ক্ষত সারানো এবং রাজনীতিকীকরণ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত করার বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে তারেক রহমানের সামনে।
দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্যের বার্তা দিয়ে আসছেন। তার বক্তব্য—প্রতিশোধ কোনো সমাধান দেয় না; বরং সংযম ও ঐক্যের মধ্য দিয়েই জাতি সামনে এগোতে পারে।
অর্থনীতি: সংস্কার ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ
শেখ হাসিনার শাসনামলে জিডিপি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়বৈষম্য সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও টাকার মান কমে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় আরও সংকুচিত হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে দরিদ্র নারী ও বেকারদের নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত করা, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ এবং প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারেক রহমান।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর। ক্ষমতার পালাবদলের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা দেখা দিলেও নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর নয়াদিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।
ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের কিছু চুক্তিতে অসামঞ্জস্য ছিল বলে মন্তব্য করে তারেক রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়েই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন করা হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচনাকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিতও রয়েছে নতুন সরকারের নীতিতে।
রাজনৈতিক ভারসাম্য ও ইসলামপন্থীদের ভূমিকা
ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির পর সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও হাসিনা সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল।
এর আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। তবে এ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের স্বার্থে সব দলের একসঙ্গে কাজ করা আবশ্যক। তিনি বলেছেন, এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয় বরং দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব, যারা গণতন্ত্রে ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাস করে।
তারেক আরও বলেন, আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে; যাতে ৫ আগস্টের আগের সময়ে আমাদের ফিরতে না হয়। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে; যেন মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে প্রাণ হারানোদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, তাদের আত্মত্যাগের মূল্য দিতে হলে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতেই হবে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের সামনে শুধু একটি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নয়—বরং রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন, আঞ্চলিক কূটনীতি সামাল দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের দৃষ্টিও তাই এখন তার নেতৃত্বের দিকে।







