সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৩৩

অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা, ৩০ বছরের আইনি লড়াইয়ের আদ্যোপান্ত

অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা, ৩০ বছরের আইনি লড়াইয়ের আদ্যোপান্ত
অনলাইন ডেস্ক

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। মাত্র ২৫ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছিল পুরো দেশে। দেখতে দেখতে সেই ঘটনার তিন দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ৩০ বছরেও মেলেনি তাঁর মৃত্যুরহস্যের চূড়ান্ত সমাধান।

সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আইনি লড়াই। সময়ের সঙ্গে মামলার গতিপথও বদলেছে। অপমৃত্যুর মামলা থেকে তা গড়িয়েছে হত্যা মামলায়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অপমৃত্যু মামলা দিয়ে শুরু

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন।

তবে শুরু থেকেই পরিবারের দাবি ছিল, সালমান আত্মহত্যা করেননি; তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন কমর উদ্দিন চৌধুরী।

এরপর আদালত অপমৃত্যু মামলার পাশাপাশি হত্যার অভিযোগও তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

সিআইডির ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে রিভিশন আবেদন করেন তাঁর বাবা।

বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগ নাকচ

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তির পর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেখানেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

এরপর মামলাটি চালিয়ে যান সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ওই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তাঁরাই সালমান শাহ হত্যার সঙ্গে জড়িত।

পরে তদন্তের দায়িত্ব র‍্যাবকে দেওয়া হলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানালে আদালত র‍্যাবকে তদন্ত না করার নির্দেশ দেন।

পিবিআইয়ের তদন্তেও আত্মহত্যার কথা

২০১৬ সালে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

২০২১ সালের অক্টোবরে আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

২৯ বছর পর মামলায় নতুন মোড়

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও থামেনি সালমান শাহর পরিবারের আইনি লড়াই। নীলা চৌধুরীর পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফের রিভিশন আবেদন করা হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক ওই রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।

এর পরদিন, ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, লতিফা হক লুছি, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বাদী দাবি করেন, ঘটনার দিন ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে তাঁরা সালমানকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। তখন কয়েকজন বহিরাগত নারী তাঁর হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার

হত্যা মামলা দায়েরের পর তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। চলতি বছরের ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে এ কারণে যে, ২০২০ সালে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের পর ডন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ২৪ বছর পর তিনি বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু সেই বক্তব্যের ছয় বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হলো।

ডনের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবীর দাবি, মামলার আরেক আসামি রেজভি আহমেদ ফরহাদ ১৯৯৭ সালে একটি অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ওই জবানবন্দিতে তিনি সালমান শাহকে হত্যার কথা এবং ঘটনায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে দাবি বাদীপক্ষের।

ডন গ্রেপ্তারের পর আদালতে ওই জবানবন্দির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

তদন্ত চলছে, প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নয়বার পেছাল

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান।

তিনি জানিয়েছেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। পাশাপাশি বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে হত্যা মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এরই মধ্যে নয়বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।

সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি। আত্মহত্যা নাকি হত্যা—দীর্ঘ তিন দশকের সেই বিতর্কের শেষ পর্যন্ত আইনি পরিণতি কী হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়