প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩৯
এলপিজি বাজারে অস্থিরতা: আমদানি জটিলতা, ভোক্তার বাড়তি চাপ

দেশের জ্বালানি বাজারে এলপিজি এখন প্রায় অপরিহার্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাস সুবিধা না থাকা শহর ও গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য পরিবারের জন্য রান্নার প্রধান জ্বালানি এই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি জটিলতা, আন্তর্জাতিক নৌপথে ভাড়া বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্যতার কারণে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর, যাদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৪১ টাকা। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই সিলিন্ডার ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা, কখনো কখনো ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। ফলে মূল্য নির্ধারণে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ এলপিজি আমদানিতে জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের ফ্রেট চার্জ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ছে। গত মাসে যেখানে এই ভাড়া প্রায় ১২০ ডলার ছিল, বর্তমানে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কিছু জাহাজে নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে প্রয়োজনীয় চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা থাকলেও ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন।
এলপিজি খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্যতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির আমদানি প্রিমিয়াম প্রায় ১৬০ ডলার হলেও বিইআরসি তা ১২০ ডলার ধরে মূল্য নির্ধারণ করছে। ফলে এই পার্থক্যের অর্থ কোম্পানিগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে।
এর ফল হিসেবে কোম্পানিগুলো ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের আগের মতো কমিশন দিতে পারছে না। কমিশন কমে যাওয়ায় ডিলাররা নিজেদের লাভ নিশ্চিত করতে খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের মতে, ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায় থেকেই সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খুচরা বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।
এলপিজির দাম কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করেছে। সরকারের দাবি ছিল, এর ফলে ভোক্তাদের ওপর ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমবে।
এরপরও বাস্তবে বাজারে দাম কমেনি। কারণ কর কমানোর সুফল সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে আটকে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি খাতকে দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। এতে বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-কে এলপিজি আমদানিতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হলে বাজারে স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে এলপিজি সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানি উৎস বৈচিত্র্য করা এবং মূল্য নির্ধারণের বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সাধারণ ভোক্তারা। পাইপলাইনের গ্যাস সুবিধা না থাকায় অনেক পরিবারের জন্য সিলিন্ডার গ্যাসই একমাত্র বিকল্প। কিন্তু যখন সরকার নির্ধারিত দামেও গ্যাস পাওয়া যায় না, তখন তা তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এলপিজি বাজারের বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক সরবরাহ সমস্যার ফল নয়; বরং এটি আমদানি ব্যয়, মূল্য নির্ধারণ কাঠামো, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতির সম্মিলিত প্রতিফলন। তাই এই খাতে টেকসই সমাধান আনতে হলে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।







