বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:১৩

জ্বালানি স্বনির্ভরতা নাকি আমদানিনির্ভরতা—কোন পথে বাংলাদেশ?

জ্বালানি স্বনির্ভরতা নাকি আমদানিনির্ভরতা—কোন পথে বাংলাদেশ?
অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। প্রায় দুই দশক ধরেই দেশের গ্যাস মজুত কমে আসা এবং ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছিল। ২০০২ সাল থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, দেশের তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ২০৩০-৩১ সালের দিকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের পরিবর্তে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর সমাধানের দিকে এগিয়েছে। এর প্রভাব এখন জ্বালানি খাতের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান।

একসময় মূলত পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। এখন কয়লা, এলএনজি ও জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রেই আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

জ্বালানি ও অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক শাহরিয়ার খানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করে। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১ দশমিক ১৯ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে এলএনজি আমদানিতে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয় ২০২৯-৩০ অর্থবছর নাগাদ বেড়ে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে, নাকি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে?

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিমের মতে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতেই দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যেতে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।

তাই তাঁর মতে, শুধু দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভর না করে এলএনজি আমদানি, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌরবিদ্যুৎ—সবগুলোকে সমন্বিত কৌশলের আওতায় আনতে হবে।

তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ এবং আরও ২ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।

বাড়ছে আমদানির খরচ

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার বড় ঝুঁকি শুধু ব্যয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও। যুদ্ধ, সংঘাত ও বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

চলতি বছরের জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে ১১টি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে। প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে গড়ে ২১ দশমিক ৩৫ ডলার দরে কেনা এসব এলএনজির পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৮০ মিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশ বিশ্লেষক ড. শফিকুল আলম মনে করেন, আমদানি করা জ্বালানির দামের অস্থিরতা থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিতে হবে। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নবায়নযোগ্য শক্তি। তবে এ খাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।

শাহরিয়ার খানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছিল নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অথচ সে সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ শতাংশের বেশি।

অন্যদিকে ২০২৬ সালে আমদানিকৃত গ্যাস, কয়লা এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎসহ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশ বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ হয়েছে। ২০২১ সালে এ হার ছিল ৪২ শতাংশ।

অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশের আমদানিনির্ভরতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অর্থনীতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

তাঁর পরামর্শ—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করতে হবে, আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজিনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সামনে কোন পথ?

জ্বালানি স্বনির্ভরতা বলতে সব জ্বালানি দেশের মাটির নিচ থেকেই উত্তোলন করতে হবে—এমন নয়। বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তির সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং আমদানির ঝুঁকি কমানো—সবগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।

শুধু এলএনজি টার্মিনাল বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আবার দেশীয় গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দেশ কি ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, নাকি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে আমদানি থাকবে, কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করবে না?

জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়