প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৩
স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুললে শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে: প্রধানমন্ত্রী

বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দল অবশ্যই বিরোধিতা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, আর অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব হলো দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
তিনি বলেন, সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা বিরোধী দলই কেবল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা জরুরি।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পাশে থাকার আহ্বান
বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানাতে সরকারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল তাঁদের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ হলো আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের পাশে থাকা এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করা।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।
কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পৃথক অবস্থান থাকতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই জনগণ তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সংসদে যুক্তি ও মতামত তুলে ধরে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন।
উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণের তাগিদ
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন ও দেশের উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তবে উন্নয়নকাজের সময় প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতার অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আরও মনোযোগ প্রয়োজন।
হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোগীরা যাতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে পারেন, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের আরও সচেতন হতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নিজেদের আচরণে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
পরিবেশদূষণ ও অপরিচ্ছন্নতা মানুষের রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানকে জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এগুলোর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সহযোগিতা কামনা করেন।
শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সবার নিরাপদে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করাও শহীদদের প্রত্যাশার অংশ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছে।
৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভে
সোমবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন তিনি।
উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ৯০ ফুট উঁচু এবং প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এর গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
আধুনিকায়ন করা হয়েছে ২৩ একরের ওসমানী উদ্যান
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান ও শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।







