রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬  |  

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:২৮

রেকর্ডসংখ্যক আসন পেয়েও অখুশি জামায়াত

রেকর্ডসংখ্যক আসন পেয়েও অখুশি জামায়াত
অনলাইন ডেস্ক

জোট আর ভোটের মাঠ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটালো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যাচ্ছে তারা। তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ আসন প্রাপ্তি বটে। তারপরও ৩০টি আসনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে অসন্তোষ রয়েছে। এসব আসনে পুনরায় ভোট গণনা চান তারা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

১২ ফেব্রুয়ারি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয় এবার। এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের জোটগত হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান নিয়েছে জামায়াত।

বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে এবং জোটগতভাবে ২১২টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তবে ৬৮টি আসনে জামায়াতের একক জয় দলটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।

বিগত নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করেছিল জামায়াত। সে সময় তারা পেয়েছিল ৩টি আসন। ২০০১ সালে ১৭টি এবং ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসনে জয় পায় দলটি। এছাড়া ঢাকায় এর আগে জামায়াত কখনও সংসদ সদস্য পায়নি। তবে এবারের নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ এই ৬টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

উত্তরাঞ্চল ও খুলনায় জামায়াতের বাজিমাত

উত্তরাঞ্চলে এবার শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে পেরেছে জামায়াত। রংপুর বিভাগের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহী বিভাগের ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত। শক্ত অবস্থান গড়েছে খুলনা বিভাগেও। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে তারা।

অন্যদিকে, নোয়াখালী–চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রত্যাশিত ফল পায়নি দলটি। বৃহত্তর ঢাকার ৭০টি আসনের মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫৮টির মধ্যে মাত্র ৩টি আসনে জয় পেয়েছে, এর মধ্যে কুমিল্লায় ১টি ও চট্টগ্রামে ২টি আসন। সিলেট বিভাগে জোটের শরিক খেলাফত মজলিশ একটি আসনে জয় পেয়েছে।

দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর পরাজয়

জামায়াতে ইসলামীর দুই হেভিওয়েট প্রার্থী, যারা পূর্বে সংসদ সদস্য ছিলেন, এবারের নির্বাচনে তারা পরাজিত হয়েছেন। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে এবং হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজার-২ আসনে জয়ী হতে পারেননি। মিয়া গোলাম পরওয়ার ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, হামিদুর রহমান আযাদ ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে রেকর্ডসংখ্যক আসন অর্জন করলেও ফলাফলকে প্রত্যাশিত বলে মনে করছেন না দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, ফলাফল প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্পষ্ট ভোট কারচুপি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব না হলে আরও ভালো ফল করা সম্ভব ছিল।

৩০ আসনের ভোট নিয়ে ঘোর আপত্তি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের এ অভিযোগ করেন। দলটির অভিযোগ, জালিয়াতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আসনে ভোট গণনায় অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর, এমনকি পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখাসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।

এহসানুল মাহবুব বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় ৩০টি আসনে এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনা দেখেছি, যেখানে ভোট জালিয়াতি হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা আরও বলেন, এই ৩০ আসনে ভোট আবার গণনার জন্য তারা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন। কিন্তু কমিশন অভিযোগ আমলে না নিয়ে ফল প্রকাশ করেছে। দেশের আরও বেশ কিছু আসনে কারচুপি হওয়ার অভিযোগ তুলে এহসানুল মাহবুব বলেন, তারা যাচাই-বাছাই করে সেই আসনগুলো নিয়েও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবেন।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসব আসনে দলটি অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোতে ভোটের ব্যবধান ১ হাজার থেকে ১০ হাজার। এসব আসনের মধ্যে পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩ ও ৫, লালমনিরহাট-১ ও ২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩ ও ৫, বরগুনা-১ ও ২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১০, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১ ও ১৭, গোপালগঞ্জ-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও কক্সবাজার-৪ রয়েছে।

ভোটে জালিয়াতির প্রসঙ্গ তুলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সাবেক আমির শফিকুর রহমান বলেন, 'নির্বাচনে জামায়াত অতীতের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে এটা সত্যি। কিন্তু বেশ কয়েকটি জেতানো আসনে আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভোটে স্পষ্ট কারচুপি হয়েছে। দিনভর সুষ্ঠু নির্বাচন দেখিয়ে, সন্ধ্যার পর ফলাফল পরিবর্তন, এরকম ইঞ্জিনিয়ারিং আমরা ঠেকাতে পারিনি। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিদেশি সংস্থা সবাই এই কারচুপিতে জড়িত ছিল।’

জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীদের ব্যালট বাতিল, সন্ধ্যার পর এজেন্টকে বের করে দেওয়া এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা, ডিসি এসপিদের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে অন্তত ৩০টি আসনে কারচুপি হয়েছে। আমাদের প্রার্থীরা ইসিতে অভিযোগ করেছেন। এখন দলীয় সিদ্ধান্তে আমরা সামনে এগিয়ে যাবো।’

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক একজন কেন্দ্রীয় কার্যকরী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জামায়াত প্রচারণায় অতিমাত্রায় নারীদের ব্যবহার করলেও, পেশি শক্তির ব্যবহার করতে পারেনি। এছাড়া দেশব্যাপী নির্বাচনি অনভিজ্ঞতা, অতিমাত্রায় স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচারণায় ঝুঁকে পড়েছিল তারা। নির্বাচনের দিন বহু কেন্দ্রে ভোটারদের উজ্জীবিত করার জন্য ও ভোট কেন্দ্রগুলোতে দখলদারত্ব প্রতিরোধে শক্ত উপস্থিতি ধরে রাখতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হবে অনুমান করেও সেটি মোকাবিলায় দক্ষ টিম নিয়ে প্রশাসনিক যোগাযোগ মেইনটেইন করতে পারেনি জামায়াত। এছাড়া ভোটের পর থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার আশপাশে শক্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারা ও স্থানীয়দের ভোটারদের সঙ্গে সমন্বয় না করে শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বরত ব্যক্তিদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়াকেও দুর্বলতা বলে মনে করেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়