প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:০৫
প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ

প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনী মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মধ্যে।
তবে প্রচারের শুরু থেকেই দুপক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সৌজন্যের পরিবর্তে তীব্র বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দুই দিনেই শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, সামনের দিনগুলোতে এই বাগ্যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
২২ জানুয়ারি প্রচার শুরুর পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা একে অপরকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্লেষকেরা আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এই দুই শক্তির মধ্যে মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে।
বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ভোট কারচুপির আশঙ্কার অভিযোগ তুলছে। অন্যদিকে জামায়াত বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখল ও চাঁদাবাজি এবং ‘নব্য ফ্যাসিবাদী’ চরিত্রের অভিযোগ সামনে আনছে।
গত দুই দিনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আটটি জনসভায় বক্তব্য দেন। তিনি জামায়াতের নাম উল্লেখ না করেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সমালোচনা করেন এবং ধর্মের অপব্যবহারের বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পোস্টাল ব্যালট ও এনআইডি ব্যবহার করে ভোট চুরির আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম, খুন, ভোটাধিকার হরণ ও অর্থপাচারের সমালোচনা করলেও মূল জোর দেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসূচির মতো প্রতিশ্রুতি দেন। জনসভায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনও তাঁর প্রচারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে ‘ইনসাফ প্রতিষ্ঠা’, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়। জামায়াত বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে ‘খয়রাতি অনুদান’ বলে সমালোচনা করে এবং এটিকে চাঁদাবাজি ও লুটপাটের আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করে।
নির্বাচনী বক্তব্যে দুই পক্ষই ‘বিদেশি আধিপত্য’ ইস্যু সামনে আনছে। বিএনপি জামায়াতকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানকেন্দ্রিক প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর জামায়াত বিএনপির বিরুদ্ধে ভারতের আধিপত্যবাদ চাপানোর অভিযোগ তুলছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ‘জাতীয়তাবাদ বনাম আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাজনৈতিক তর্ক ও সমালোচনা স্বাভাবিক হলেও তা যেন সংঘাতে রূপ না নেয়—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, দেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনী লড়াই এখন মূলত বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের মুখোমুখি প্রতিযোগিতা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।







