প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:২৪
বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব নয়: নাহিদ ইসলাম

বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের দলীয়করণ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার রজনীগন্ধা মিলনায়তনে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচ জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আগে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, এমনটা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে না। এই কয়েক দিনে সরকারদলীয় অন্তঃকোন্দলে কয়েকশ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে এবং ক্রমাগত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হবে। সেই প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া উচিত।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা জীবন ও রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করেছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই আদর্শিক। দলটি পরাজিত হলেও ফ্যাসিবাদের দোসররা বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের পাশাপাশি নতুন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ শক্তিও একাকার হয়ে গেছে। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।
সাংবাদিকদের নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের আপত্তিকর মন্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ এ ধরনের কথা বলতে পারে না। নিজেদের দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর পরিবর্তে পুলিশের দায়িত্ব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা।
সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাদের তথ্যে ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে পুলিশের প্রধান দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন মন্তব্য করা উচিত নয় বলে জানান তিনি।
মাদক সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের একটি অংশ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বলে তারা মনে করেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাদকের সিন্ডিকেট টিকে থাকতে পারে না।
আগে আওয়ামী লীগ এই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, এখন বিএনপি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই সিন্ডিকেট ভেঙে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারলে মাদক নির্মূল সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে সাংবাদিকদের ওপর গুলি চালানো ও মারধরের ঘটনা ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের সমালোচকদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের পাশে রয়েছেন তাঁরা। এসব বিষয় সংসদেও তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে কার্যকর কোনো সংস্কার হয়নি। ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা এখনো ফিরে আসেনি। মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখতে আস্থা পাচ্ছে না।
বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসেনি বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াবে না এবং মানুষের আস্থাও ফিরবে না। রাজনৈতিক সহযোগিতায় ঋণ নিয়ে অর্থ বিদেশে পাচারের প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে অংশ নেবে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ১১ দলীয় জোট জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত এবং বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলীয় জোট হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। গণভোটের দাবি ও জাতীয় ইস্যুতে জোটগত কর্মসূচি থাকলেও এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি, নীতি-আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আলাদা।
জাতীয় স্বার্থে এবং সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তারা একসঙ্গে থাকতে পারেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নিয়ে সারা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
প্রেস ব্রিফিং শেষে পাঁচ জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন এনসিপির নেতারা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব, সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ দক্ষিণ) আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ দক্ষিণ) হাসিবুর রহমান অপু, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিলসহ পাঁচ জেলার নেতারা।







